বাংলা নববর্ষ ১৪২৬.....
রঙিন হোক আপনার জীবন
রঙিন হোক আপনার জীবন
সবাইকে নববর্ষে শুভেচ্ছা আমার এবং আমার প্রথম ওয়েব সাইট থেকে আমার সাইটটি পতি নিয়ত নতুন লেখা যোগ করা হয় ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর’ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলা নিকেতন ফুলে-ফলে, শস্য-শ্যামলে, সৌন্দর্যে-সমারোহে, লীলা বৈচিত্র্যে, রূপ লাবণ্যে ভরা আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমি। বছরের বিভিন্ন সময়ে অপূর্ব দৃশ্য দেখে মনে হয়, বিধাতা যেন সব সৌন্দর্য উজাড় করে দিয়েছেন। অসাধারণ সৌন্দর্য দেখে মোগল আমলে এমনকি প্রাচীনকালেও সিজার, ফ্রেডারিক, বার্নিয়ের, ইবনে বতুতা ও টেভানিয়ার প্রমুখ বৈদেশিক পর্যটক মুগ্ধ হয়েছিলেন। এদেশে ছয়টি ঋতু নিরন্তর চক্রাকারে আবর্তিত হয়ে চলছে। লীলাময়ী প্রকৃতি এখানে মুক্তহস্তে সৌন্দর্য বিতরণ করছে। তাই এ দেশকে প্রকৃতির সুরম্য লীলা নিকেতন বললে মোটেই অত্যুক্তি হবে না। বহতা নদীর মতো বয়ে চলছে সময়, কেটে যাচ্ছে বছরের পর বছর।
বাংলা নববর্ষ এবং বাঙালির প্রাণের উৎসব আয়োজন যেন এক সূত্রে গাথা। পুরাতনকে পেছনে ফেলে নিজ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে বক্ষে ধারণ করে নতুন বর্ষকে বরণ করতে উদগ্রীব সারা বিশ্বের বাঙালি প্রাণ। তাই বাঙালির সর্বজনীন, অসাম্প্রদায়িক মহোৎসব কিভাবে এবং কেন এলো তা আমাদের জানা উচিত। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজ্য শুরুর পর থেকে আরবি বছর হিজরি পঞ্জিকা অনুযায়ী কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করা হতো। কিন্তু হিজরি সাল চাঁদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় কৃষি ফলনের সঙ্গে এর কোনো মিল পাওয়া যেত না। আর তখনই এ বিষয়ের সুষ্ঠু সমাধানের জন্য সম্রাট আকবর বাংলায় বর্ষপঞ্জি সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সম্রাটের আদেশ অনুযায়ী সে সময়কার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ আমির ফয়েজ উল্লাহ সিরাজী সৌর বছর ও আরবি হিজরি সালের ওপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম তৈরির কাজ শুরু করেন।
বাংলা বছর নির্ধারণ নিয়ে লেখা বিভিন্ন বইয়ের প্রাপ্ত তথ্য মতে, ১৫৮৪ খ্রি. ১০ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে নতুন সালটি স¤্রাট আকবরের রাজত্বের ২৯তম বর্ষে প্রবর্তিত হলেও তা গণনা করা হয় ১৫৫৬ সালের ৫ নভেম্বর। অর্থাৎ সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহণের তারিখ থেকে। প্রথমে ফসলি সন বলা হলেও পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিতি পেতে শুরু করে। এভাবে বাংলা সনের জন্মলাভ ঘটে। উল্লেখ করা যেতে পারে, ৯৬৩ হিজরির বাংলা বৈশাখ মাসের সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকায় তার সঙ্গে মিল রেখে ৯৬৩ বঙ্গাব্দের সূচনা করা হয়। অর্থাৎ শূন্য থেকে বাংলা সনের গণনা শুরু হয়নি।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলা মাসের নামগুলো বিভিন্ন তারকারাজির নাম থেকে নেওয়া হয়েছে। যেমন- বিশাখা থেকে বৈশাখ, জ্যেষ্ঠা থেকে জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়া থেকে আষাঢ়, শ্রাবণা থেকে শ্রাবণ, ভাদ্রপদা থেকে ভাদ্র, আশ্বিনী থেকে আশ্বিন, কার্তিকা থেকে কার্তিক, অগ্রহায়ণ থেকে অগ্রহায়ণ, পৌষা থেকে পৌষ, মঘা থেকে মাঘ, ফাল্গুনী থেকে ফাল্গুন এবং চিত্রা থেকে চৈত্র। সম্রাট আকবরের সময়ে মাসের প্রত্যেকটি দিনের জন্য আলাদা আলাদা নাম প্রচলিত থাকায় জনসাধারণের মনে রাখা খুবই কষ্ট হতো। পরবর্তীতে সম্রাট শাহজাহান সাত দিনের সপ্তাহভিত্তিক বাংলায় দিনের নামকরণের কাজ শুরু করেন। ইংরেজি সাত দিনের নামের সঙ্গে কিছুটা আদলে বাংলায় সাত দিনের নামকরণ করা হয়। যেমন-সানডে রবিবার। সান অর্থ রবি বা সূর্য আর ডে অর্থ দিন। এভাবে বর্ষ গণনার রীতিকে বাংলায় প্রবর্তনের সংস্কার শুরু হয় মোগল আমলে। বর্তমানে বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাঙালিদের যোগাযোগ নিরবচ্ছিন্ন রাখার সুবিধার্র্থে বাংলাদেশের সব জায়গাতেই খ্রিস্টীয় সন ব্যবহার করা হয়। বাংলা একাডেমি কর্তৃক নির্ধারিত পঞ্জিকা অনুসারে প্রতিবছর ১৪ এপ্রিল নববর্ষ পালিত হয়। বাংলা দিনপঞ্জির সঙ্গে হিজরি ও খ্রিস্টীয় সনের মৌলিক কিছু পার্থক্য রয়েছে। তা হলো হিজরি সাল চাঁদের সঙ্গে আর খ্রিস্টীয় সাল চলে ঘড়ির সঙ্গে। এ কারণে হিজরি সনের নতুন তারিখ শুরু হয় সন্ধ্যায় নতুন চাঁদের আগমনের মধ্য দিয়ে, ইংরেজি দিন শুরু হয় মধ্যরাতে আর বাংলা সনের শুরু হয় ভোরের সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে।
প্রাচীন আরবে ‘ওকাজ মেলা’ ইরানিদের ‘নওরোজ উৎসব’ এবং প্রাচীন ভারতীয়দের ‘দোল পূর্ণিমা’, কোরিয়ানদের ‘সোল-নাল’ আর সব বাঙালির ‘পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ’ (সামাজিক উৎসব) সবার অন্তরে ছড়িয়ে দেয় আনন্দ। বর্ষবরণের মূল আয়োজন ঢাকার রমনা বটমূলে শুরু হলেও সেই আনন্দ আয়োজনের ঢেউ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। পান্তা, ইলিশ আর নানার রকম ভর্তার বাঙালিপনায় জাতি নিজেকে খুঁজে ফেরে বর্ষবরণের ব্যস্ততায়। সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী ও ছায়ানটের শিল্পীদের সম্মিলিত কণ্ঠে গান, আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের শোভাযাত্রা, মঙ্গলযাত্রা, নানা রকম বাদ্যযন্ত্র, বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিলিপি ও রং-বেরঙের বানানো মুখোশ, শাড়ি, পাঞ্জাবি ও ফতুয়া পরে ঘুরে বেড়ানোর মধ্য দিয়ে পালিত হয় পহেলা বৈশাখ। এ উপলক্ষে জাতীয় দৈনিক পত্রিকাগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ, বিটিভিসহ বিভিন্ন স্যাটেলাইট চ্যানেল অনুষ্ঠানমালা সরাসরি সম্প্রচার করে। সরকারি ছুটির দিন থাকায় কর্মজীবী ও পেশাজীবীরা তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে বিভিন্ন মেলায় অংশগ্রহণ করে। কোটি কোটি বাঙালির এই দিনে আনন্দ বা বিনোদনের শেষ নেই। এদিন ভোরের সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সংগীত শিল্পীরা পয়লা বৈশাখকে গানে গানে, সুর ও সংগীতের মূর্ছনায় স্বাগত জানিয়ে বরণ করে নেয়। তাই বারবার ফিরে আসে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী গানটি, যা সবাই সম্মিলিতভাবে গেয়ে ওঠে-‘এসো হে বৈশাখ, এসো, এসো...জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক।’
সবাইকে শুভ নববর্ষ ১৪২৬



